টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিসে সরকারের রাজস্ব কমছে : পকেট ভারী হচ্ছে এডির - TangailTimes24
  • সংবাদ শিরোনাম

    টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিসে সরকারের রাজস্ব কমছে : পকেট ভারী হচ্ছে এডির

    রাইসুল ইসলাম লিটন:


    টাঙ্গাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি(বিআরটিএ) এক বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে ৪২ লাখ ৯ হাজার ২০৯ টাকা। দালালদের দৌরাত্ম্য, সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়, অনলাইন আবেদন বুঝতে না পারায় অহেতুক হয়রানি সহ নানা কারণে অংশীজনরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় রাজস্ব আদায় কমেছে।

    টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিসে


    টাঙ্গাইল বিআরটিএ সূত্রে জানাগেছে, মোটরযান রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলি, রোড পারমিট, ফিটনেস নবায়ন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি কার্যক্রম থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৭ টাকা।


    এরমধ্যে ৮ হাজার ৭৮১টি মোটরযান রেজিস্ট্রেশন থেকে আদায় হয়েছে ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭২ হাজার ৫২৩ টাকা। ৪২৭টি মোটরযানের মালিকানা পরিবর্তনে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৫ টাকা। এক হাজার ২৪৬টি ফিটনেস নবায়নে ২৭ লাখ ২৬ হাজার ৬২৪ টাকা। ৩০৮টি রোড পারমিট নবায়নে আদায় হয়েছে ১০ লাখ ৯১ হাজার ৫৩১ টাকা। ৬ হাজার ৯১২টি ট্যাক্স টোকেন ইস্যু করে আদায় হয়েছে এক কোটি ৬০ লাখ ১২ হাজার ৮৭৩ টাকা। ২৩ হাজার ২০১টি শিক্ষানবিস ড্রাইভিং
    লাইসেন্স(লার্নার) ইস্যু থেকে আদায় হয়েছে ৭৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৪১ টাকা। অথচ করোনা মহামারীর প্রভাব থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে ওইসব খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৬২ হাজার ৮৯৬ টাকা। যা বর্তমান বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বেশি। সরকারের রাজস্ব কমলেও সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেনের পটেক দিন দিন ভারী হচ্ছে।


    নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, মো. আলতাব হোসেন ২০০৬ সালের দিকে বিআরটিএতে ইন্সপেক্টর(মোটরযান) পদে যোগদান করেন। পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে টাঙ্গাইলে যোগদান করেন। সহাকারী পরিচালক হয়ে তিনি টাঙ্গাইল বিআরটিএকে ব্যক্তিগত টাকার উৎস হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন।


    সরকারের রাজস্ব কমলেও তিনি কামাই করতে থাকেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। সেই টাকায় ঢাকায় তিনি দুটি বাড়ি ও একটি আড়াই কাঠা প্লট কিনেছেন। পল্লবীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ‘কে’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর প্লটে তিনি ছয়তলা বিলাসবহুল বাড়ি করেছেন। ঢাকা মেট্রো-গ-২৭-২৫২৫ নম্বরের একটি প্রাইভেটকারের মালিকও তিনি। তবে গাড়িটি তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন। পশ্চিম ভাসানটেকের শ্যামল পল্লী আবাসিক এলাকায়ও মো. আলতাব হোসেন তিনতলা বাড়ি করেছেন। ওই বাড়িটি দেখভাল করেন তার মামা পরিচায় দানকারী অটোরিকশাচালক আলহাজ। মিরপুরের জল্লাদখানা এলাকায় তার আড়াই কাঠার একটি প্লটও রয়েছে। এর বাইরে আলতাফের আরও সম্পত্তি থাকলেও সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।


    সরেজমিনে দীর্ঘ দুই মাস পর্যবেক্ষণ করে দেখাগেছে, একটি টেবিল নিয়ে বসে আছেন সাজেদুল করিম সাজু নামে এক যুবক। তিনি বিআরটিএ’র কেউ নন।


    স্মার্টকার্ড(লাইসেন্স) গ্রহন করতে প্রাপকদের টাকা দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও তিনি ২০০ টাকা নিয়ে লাইসেন্স বিলি করছেন। কথাচ্ছলে তিনি জানান- সব টাকাই সহকারী পরিচালক নিয়ে থাকেন। তিনি শুধু গ্রহন করেন মাত্র। টাঙ্গাইল বিআরটিএ’র শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স(লার্নার) ইস্যু থেকে লিখিত,
    মৌখিক(ভাইভা) ও ব্যবহারিক(প্র্যাকটিকাল) পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন, ইন্সপেক্টর গোলাম সরওয়ার। তাকে সব কাজে সহযোগিতা করেন আল আমিন নামে অপর যুবক। কিন্তু তার কথায় ইন্সপেক্টর ও সহকারী পরিচালক সব কাজই করেন।


    অথচ ওই যুবক বিআরটিএ’র কেউ নন। আলআমিন শিক্ষানবিশ লাইসেন্স গ্রহনকারীদের কাছ থেকে তিনটি পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নিমিত্তে পাঁচ হাজার করে টাকা আদায় করে থাকেন। দিনশেষে ওই টাকা অফিসার ও নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। সবাই তাকে বিআরটিএ’র আলআমিন হিসেবে চিনেন।


    টাঙ্গাইল বিআরটিএ’র সব ধরণের রেজিস্ট্রেশন অফিসের রেজিস্ট্রারে লিখে রাখার কাজ করেন বেল্লাল হোসেন মিলন নামে অপর যুবক। তিনি গ্রাহকদের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করার সময় সরকারি ফি’র বাইরে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করতে এক হাজার, সিএনজি চালিত অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশনে ৮ হাজার টাকা অতিরিক্ত নিচ্ছেন। ফিটনেসের ক্ষেত্রে অনলাইনে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট প্রক্রিয়া
    গ্রাহকের সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও তারা নিজেরাই করে নেন। অনলাইনে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট দেখানো হলেও গাড়ি না দেখেই রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ দেওয়া হচ্ছে। এজন্য গ্রাহকের কাছ থেকে আলাদা নানা অংকের টাকা নেওয়া হয়।


    দেখাগেছে, জেলা প্রশাসনের ১১৪ নম্বর রুমে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির মৌখিক(ভাইভা) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ওই পরীক্ষায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ও বিআরটিএ’র একজন ইন্সপেক্টর থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি মৌখিক পরীক্ষায় অফিসের উচ্চমান সহকারী মো. কামরুল হোসেন অংশ নেন। ইতোপূর্বে উল্লেখিত পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধকারীদের
    তিনি মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখান। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাকে অকৃতকার্য দেখানো হয়।
    খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, টাঙ্গাইল বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন সপ্তাহের রোববার অফিস করেন না। মোবাইল ফোনে বা অফিসে গিয়ে কেউ জিজ্ঞাসা করলে অফিস থেকে বলা হয়- তিনি জরুরি কাজে ঢাকায় আছেন বা অফিসের কাজে মধুপুর কিংবা অন্যকোন উপজেলায় গিয়েছেন। কিন্তু দুই মাস ওই অফিসের আশপাশে অবস্থান করে রোববারে তার অফিসে না আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সিএনজি চালিত গাড়ির সিলিন্ডার রিটেস্ট করে ফিটনেস সনদ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।


    কিন্তু টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিস রিটেস্ট ছাড়াই নগদ ১৫০০-২০০০ টাকা নিয়ে
    ফিটনেস সনদ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক সূত্র জানায়, টাঙ্গাইল বিআরটিএ অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রশাসনের ২-১ জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রয়েছেন। ওই সিন্ডিকেটই দালালদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। 

    সাজেদুল করিম সাজু, আলআমিন ও বেল্লাল হোসেন মিলনের সহযোগী হিসেবে ১৫-২০ জন দালাল রয়েছে। তারা নানা অযুহাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে আরও একদফা টাকা আদায় করে উল্লেখিতদের কাছে পাঠায়। কোন গ্রাহক সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে না চাইলে
    অহেতুক হেনস্তা করা হয়। 

    সূত্রমতে, টাঙ্গাইল বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. আলতাব হোসেন ও ইন্সপেক্টর(লাইসেন্স) গোলাম সরওয়ার একই জেলার বাসিন্দা হওয়ায় তারা যৌথভাবে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছেন। তাদের কারণে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এজন্য সেবা গ্রহীতারা টাঙ্গাইল অফিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।


    সেবা গ্রহীতারা ঢাকা সহ অন্য অফিসের সেবা নেওয়ায় এ অফিসে রাজস্ব কমেছে। বিআরটিএ’র কেউ না হয়েও অফিশিয়াল কাজ করা মো. আল আমিন জানান, এক সময় বিআরটিএ অফিস ঘিরে দালালচক্র সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখন কোন দালাল নেই। তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি অফিসে গিয়ে চা-টা খেয়ে আসতে বলেন।


    অফিসের উচ্চমান সহকারী(ইউডিএ) মো. কামরুল হোসেন জানান, অফিসের বিষয়ে তিনি
    কোন মন্তব্য করার এখতিয়ার রাখেন না। তবে অফিসের সকল কাজ সহকারী পরিচালকের
    নির্দেশে হয়ে থাকে।


    টাঙ্গাইল বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন জানান, তিনি যথারীতি নিয়মিত অফিস করেন। টাঙ্গাইল কার্যালয়ে তিনি সহ ৮জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। এরমধ্যে একজন ইন্সপেক্টরের পদ শূণ্য রয়েছে। অফিসে মাস্টাররোল বা অন্যকোন বাড়তি লোক নেই। তার অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য নেই। গ্রাহকরা অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করে সেবা নিয়ে থাকে। কাউকে কোন প্রকার অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়না।
    এক বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধকোটি টা

    কা রাজস্ব কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, অনলাইনে আবেদন সম্পর্কে অনেকের ধারণা না থাকা ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে রাজস্ব আদায় কমেছে। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। এবছর কম হলেও আগামিতে বেশিও হতে পারে।

    No comments

    Post Top Ad

    ad728

    Post Bottom Ad

    ad728